আহওয়ালে বরযখ বা কবরের জীবন
সকল প্রশংসা পরোয়ারদিগারে
আ'লম আল্লাহ তাআ'য়ালার জন্য নিবেদিত। সালাত ও সামাল পেশ করছি সৃষ্টিকুলের শ্রেষ্ঠ মানব আমাদের এবং সব
নবী-রাসূলের নেতা হযরত
মুহাম্মদ (সাঃ) -এর প্রতি এবং তাঁর পরিবার পরিজন ও সাহাবীগনের প্রতি আর কেয়ামত পযর্ন্ত যারা
তাঁর অনুসারী হবেন তাদের প্রতি।
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর হাদীস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, যদিও মৃত্যুর পর মানুষকে আমরা পচনশীল লাশ মনে করি, আসলে তারা লাশ নয় বরং জীবিতই থাকে। তবে তাদের জীবন আমাদের এ পার্থিব জীবনের সম্পর্নই বিপরীত। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেনঃ "মৃতের হাড় ভাঙ্গা জীবিতদের হাড় ভাঙ্গার মতই।" -(মেশকাত, আবু দাউদ, ইবনে মাজা ও মালেক)
মহা নবী (সাঃ) কোন এক সময় আমর ইবনে হাযম (রাঃ) -কে একটি কবরের সাথে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় দেখে বলেনঃ "এ কবরে সমাহিত ব্যক্তিকে কষ্ট দিওনা।" -(মিশকাত)
মৃতেুর পর মানুষ এ পার্থিব জগত হতে পরজগতে চলে যায়। তাকে কবরে সমাহিত করা না হলে, বা চিতার আগুনে জ্বালানো না হলেও তার স্থান হয় পরকালে। সেখানে অবস্থানকালে তার চেতনা উপলব্ধিও থাকে বিদ্যমান।
মহানবী (সাঃ) বলেনঃ "মৃত লাশ চৌখাটে করস্থানে নেয়ার জন্য মানুষ যখন তা কাঁধে বহন করে, তখন সে পূর্ণবান হলে বলে, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে চলো। আর যদি সে পূর্ণবান না হয়, তাহলে স্বীয় পরিবার পরিজনকে বলে, হায়! আমার ধ্বংশ, তোমরা আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? মানুষ ছাড়া প্রত্যেক প্রাণী তার একথা শুনতে পায়। আর মনুষ যদি একথা শুনতে পেত, তবে অবশ্যই সে বেহুশ হয়ে পরত।" -(বোখারী)
মৃত্যুর পর থেকে কেয়ামত সংঘটিত না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তির জীবনে যে সময়কাল অতিবাহিত হয়, একে বরযখ বা কবরের জীবন বলা হয়। বরযখ শব্দের আভিধানিক অর্থ- পর্দা বা আড়াল। যেহেতু এসময় কালটি দুনিয়া ও আখেরাতের একরি পর্দা বা আড়াল বিশেষ। এজন্যই একে বরযখ বলা হয়।
সাধারনত মানুষ যেহেতু তাদের মৃতদেরকে কবরে সমাহিত করে, সেহেতু হাদীসের ভাষায় বরযখকালের শান্তি ও শাস্তিকে কবর আযাব নামেই উল্লেখ করা হয়েছে। এর মর্ম এই নয় যে, যেসব মৃতকে আগুনে জ্বালানো হয়, বা গভীর পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তারা বরযখের সময়কালে জীবিন্ত থাকেনা। আসলে তারাও বরযখে জীবন্ত কাল কাটায়। তারা হয় শান্তিতে না অথবা শাস্তিতে নিপতিত থাকে। যারা কাফের ও মুশরিক অবস্থায় মারা যায়, তারা বরযখের জীবনে কোন আরাম বা শান্তি ভোগ করতে পারেনা। তারের জন্য রয়েছে শাস্তি আর শাস্তি। আল্লা তাআ'লা মানব দেহের জলন্ত ভস্ম একত্রিত করেও শান্তি বা শাস্তি দিতে পুরো মাত্রায় সক্ষম। হাদীসে আছে, পূর্ব যমানায় এক ব্যক্তি খুবই গুনাহের কাজ করত। তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে সে পুত্রগণকে এ ওছিয়ত করলো যে, তোমরা আমার মরদেহটি আগুনে জালিয়ে দেবে, আর আমার ছাইভষ্মের অর্ধেক বায়ুমন্ডলে উরিয়ে দেবে এবং বাকী অর্ধেক সমুদ্রের গভীর পানিতে মিশিয়ে নিঃশেষ করে ফেলবে। এরপর সে আরো বললো, আল্লাহ তাআ'লা যদি এরপরও আমাকে জীবিত করতে সক্ষম হন, তাহলে অবশ্যই আমাকে এমন কঠোর শাস্তি দেবেন, যা আমাকে ছাড়া ত্রিভুবনে আর কাউকে দেবেননা।
লোকটির মৃত্যুর পর পুত্রগণ পিতার অন্তিমকালের ওছিয়তমত কাজ করল। অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা সমুদ্রকে ঐ ব্যক্তির দেহ ভস্মগুলোকে একত্রিত করার নির্দেশ দিলে সমুদ্র তা একত্রিত করল। এমনি ভাবে স্থলভাগের বায়ুমন্ডলকে ভষ্মগুলোকে একত্রিত নির্দেশ দিলে সে-ও তা একত্রিত করল। তখন আল্লাহ তাআ'লা উভয় স্থানের ভষ্ম একত্রিত করে তাকে জীবিত করলেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি এমন ওছিয়ত কেন করলে? সে বললো, হে আমার প্রতিপালক! আমি যে তুমার শাস্তির ভয়ে এরুপ করেছি, তাতো তুমি ভালভাবেই অবগত আছ। অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা একে ক্ষমা করে দেন। -(বোখারী, মুসলিম)
হাদীসের বর্ণনা দ্বারা এও জানা যায় যে, মৃত্যুর পর মুমিন বান্দাগণ একে অপরের সাথে সাক্ষাত করেন। আর নবাগত মৃত মুমিন ব্যক্তির কাছে অপরাপর মুমিন ব্যক্তিরা জিজ্ঞেস করে- অমকের অবস্থা কি? সে কি অবস্থায় আছে?
হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (র) বলতেন, কারো মৃত্যু হলে কবরের জীবনের তার মৃত সন্তাগণ তাকে এমন ভাবে সম্বর্ধনা জানায়, যেরুপ পার্থিব জীবনে কোন বহিরাগত লোককে সম্বর্ধনা জানানো হয়। -(শহরে সুদুর)
হযরত ছাবেত বানানী (র) কারো মৃত্যুর পর কবর জীবনে তার পূর্বে মৃত নিকটাত্মীয়গণ তার কাছে এসে তাকে ঘিরে ধরে। তারা পরষ্পর এতো বেশী খুশী হয়, যেমন পার্থিব জীবনে বহিরাগত কারো আগমন হলে তার সাথে সাক্ষাতে খুশী হয়ে থাকে। -(শহরে সুদুর)
হযরত কায়েস ইবনে কোবায়সাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলছেনঃ কেউ মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ না করলে তাকে অন্যান্য মৃতদের সাথে কথোপকথনের অনুমিত দেয়া হয়না। জৈনক সাহাবী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! মৃতের সাথে কি অন্যান্য মৃতরাও কথা বলতে পারে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ হ্যাঁ কথাত বলেই তদপরি তাদের পরষ্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাতও হয়। -(শহরে সুদুর, বুশরাল কাতীব বিলিকায়েল হাবীব-সুয়ুতী)
হযরত আয়শা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের কবর যিয়ারত করে এবং তার কবরের পাশে বসে, কবরে সমাহিত ব্যক্তি তাকে তার সালামের জওয়াব দেয় এবং যিয়ারতকারী চলে আসা পর্যন্ত তাকে চিনতে ও বুঝতে সক্ষম হয়। -(ইবনে আবি দুনিয়া ও শহরে সুদুর)
হযরত উম্মে বাশার (রাঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহর (সাঃ) -এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মৃতরা কি একে অপরকে চিনতে পারে? তিনি বললেন, তোমার কল্যাণ হেক। মুতমাঈন আত্মা বা (যেসব মুমিনের আত্মা আল্লাহ তাআ'লার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তা) জান্নাতে সবুজ পাখীর হৃদয় অভ্যন্তরে অবস্থান করে। এখন বুঝে নাও পাখীরা যদি বৃক্ষে থাকতে একে অপরকে চিনতে পারে, তাহলে মুমিনের আত্মাসমূহও একে অপরকে চিনে নিতে পারবে। -(ইবনে সায়াদ, শহরে সুদুর)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ "যে ব্যক্তি কোরআন মজীদ পাঠ শিক্ষা শুরু করে শেষ করার পূর্বেই মারা যায়, কবরে একজন ফেরেশতা তাকে কোরআন মজীদ শিক্ষাদেন। আর সে আল্লাহ তাআ'লার সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করবে যখন সে সম্পর্ন কোরআন মজীদের হাফেজ হবে। -(শহরে সুদুর)
যারা এ পার্থিব জীবন পূর্ণময় কর্মে অতিবাহিত করেন এবং মৃত্যুর পরের জীবনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস পোষন করেন, এ দুনিয়ার প্রতি তাদের মন আকৃষ্ট হয় না। তারা ইহকালের চেয়ে পরকালের জীবনকেই প্রাধান্য দেয়। আর যারা পার্থিব জীবনকে খারাপ ও অন্যায় কাজে অতিবাহিত করে তারা মৃত্যুর কথা স্মরনেই ভয় পায়।
সোলাইমান ইবনে আবদুল মালেক আবু হাযেম (র) এর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা মৃত্যু সসম্পর্কে ভীত হই কেন বলবেন কি? তিনি বললেনঃ এর কারন হচ্ছে, তোমরা দুনিয়াকে খুব সুন্দর ভাবে আবাদ কর এবং পরকালকে বরবাদ কর। সুতরাং আবাদকৃত জায়গা হতে বরবাদকৃত স্থানে যাওয়া পছন্দ হয় না। সোলাইমান বললেন, আপনি যথার্থ বলেছেন। -(ফিকাতুস সাফওয়াহ ২য় খন্ড ৮৯ পৃ)
কবর জীবনের প্রতি যে সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস রাখে এবং নিজের পূণ্যময় কর্মের প্রতিদানে সেখানে ভালো অবস্থায় থাকার আশা পোষন করে। আর মনে করে যে, এই পার্থিব জগতের ভাই-বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজন করে চলে যেতে হবে। তারা কবরের জীবনেও আত্মীয়-স্বজন পরিচিত ব্যক্তিদের সাথে দেখা-সাক্ষাত লাভ করবে। সুতরাং মৃত্যুকে তার সুতরাং মৃত্যুকে তারা কেন ভায় পাবে? আর এ ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনকে কেনই বা কবর জীবনের উপর প্রধান্য দেবে? রসূল (সাঃ) বলেনঃ মানুষ এ পার্থিব জীবনকে খুব পছন্দ করে ও ভালবাসে। -(বায়হাকী- শেয়াবুল ঈমান)
কোন কোন বর্ণনায় আছে, রসূলুল্লাহ (সাঃ) মুমিনের জন্য মৃত্যুকে উপঢৌকন বলেছেন -(বায়হাকী ও মেশকাত)। তিনি এও বলেছেন, যে, মানুষ মৃত্যুকে খারাপ জানে ও অপছন্দ করে, অথচ দুনিয়ার ফেৎনা-ফাসাদ ও আল্লাহর পরীক্ষায় নিপতিত হওয়ার চেয়ে তার জন্য মৃত্যুই উত্তম। মৃত্যু যত তাড়াতাড়ি হবে, ততো তাড়াতাড়ি দুনিয়ার ফেৎনা-ফাসাদ থেকে নিরাপদ হওয়া যাবে। -(শহরে সুদুর)
হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ মানুষের দুনিয়া হতে ইন্তেকাল করে পরকালে চলে যাওয়ার উদাহরন হচ্ছে -শিশু যেমন মায়ের সংকীর্ণ ও অন্ধকার জঠোর হতে জন্ম লাভ করে পার্থিব জগতের আলো-বাতাসের আরামপ্রদ ও সুন্দর পরিবেশে চলে আসে, অনুরুপ ভাবে মানুষ দুনিয়ার অশান্তিময় জীবন হতে ইন্তেকাল করে। এক বিরাট প্রশস্তময় জীবনে প্রদার্পন করে। মোট কথা মুমিনের জন্য মৃত্যু খুবই উত্তম বিষয়। কিন্তু শর্ত হচ্ছে তার জীবন হতে হবে পূ্ণ্যময় জীবন এবং তার ও আল্লাহ তাআ'য়ালার মধ্যকার সম্পর্ক সঠিক ও সুন্দর রাখতে হবে। আল্লাহ তাআ'য়ালার যেসব বান্দা পুণ্যময় কর্মে জীবন অতিবাহিত করেন, তাঁরা মৃত্যুকে পার্থিব জীবনের উপর প্রধান্য দেন। পার্থিব জীবনের বিপদাপদ, ফেৎনা ও অস্থিরতাপূর্ণ জীবন থেকে বের হয়ে খুব তাড়াতাড়ি পরকালে চিরশান্তি ও সুখময় জীবনে পদার্পণ করতে আগ্রহী থাকেন।
কোন একসময় হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) জৈনক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছো? সে বললো, বাজারে যাওয়ার ইচ্ছা রাখি। তখনি তিনি বললেন, যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয় তাহলে আমার জন্য মৃত্যু ক্রয় করে নিয়ে আসবে।-(ইবনে আবূ শায়রা, বায়হাকী)
একথার মর্ম হচ্ছে- এ দুনিয়ায় বসবাস করা আমার পছন্দ নয়। যদি মূল্য দ্বারাও মৃত্যু ক্রয় করা যায় তবে তা ক্রয় করে নেব।
হযরত খালেদ ইবনে মায়াদান (রাঃ) বলতেন, যদি কেউ এ কথা বলে, অমক জিনিষ যে ষ্পর্স করবে, তৎক্ষণাত সে মারা যাবে। তাহলে আমার পূর্বে কেউ তা ষ্পর্স করতে পারবেনা। তবে কেউ যদি আমার চেয়ে বেশি দৌঁড়াতে পারে এবং আমার পূর্বেই তার নিকটে পৌঁছে যায়, তাহলে অন্যকথা। -(ইবনে সায়াদ)
বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) -এর হাদীস দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রতিয়মান হয় যে, যদিও মৃত্যুর পর মানুষকে আমরা পচনশীল লাশ মনে করি, আসলে তারা লাশ নয় বরং জীবিতই থাকে। তবে তাদের জীবন আমাদের এ পার্থিব জীবনের সম্পর্নই বিপরীত। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলেছেনঃ "মৃতের হাড় ভাঙ্গা জীবিতদের হাড় ভাঙ্গার মতই।" -(মেশকাত, আবু দাউদ, ইবনে মাজা ও মালেক)
মহা নবী (সাঃ) কোন এক সময় আমর ইবনে হাযম (রাঃ) -কে একটি কবরের সাথে হেলান দিয়ে বসা অবস্থায় দেখে বলেনঃ "এ কবরে সমাহিত ব্যক্তিকে কষ্ট দিওনা।" -(মিশকাত)
মৃতেুর পর মানুষ এ পার্থিব জগত হতে পরজগতে চলে যায়। তাকে কবরে সমাহিত করা না হলে, বা চিতার আগুনে জ্বালানো না হলেও তার স্থান হয় পরকালে। সেখানে অবস্থানকালে তার চেতনা উপলব্ধিও থাকে বিদ্যমান।
মহানবী (সাঃ) বলেনঃ "মৃত লাশ চৌখাটে করস্থানে নেয়ার জন্য মানুষ যখন তা কাঁধে বহন করে, তখন সে পূর্ণবান হলে বলে, আমাকে তাড়াতাড়ি নিয়ে চলো। আর যদি সে পূর্ণবান না হয়, তাহলে স্বীয় পরিবার পরিজনকে বলে, হায়! আমার ধ্বংশ, তোমরা আমায় কোথায় নিয়ে যাচ্ছো? মানুষ ছাড়া প্রত্যেক প্রাণী তার একথা শুনতে পায়। আর মনুষ যদি একথা শুনতে পেত, তবে অবশ্যই সে বেহুশ হয়ে পরত।" -(বোখারী)
মৃত্যুর পর থেকে কেয়ামত সংঘটিত না হওয়া পর্যন্ত ব্যক্তির জীবনে যে সময়কাল অতিবাহিত হয়, একে বরযখ বা কবরের জীবন বলা হয়। বরযখ শব্দের আভিধানিক অর্থ- পর্দা বা আড়াল। যেহেতু এসময় কালটি দুনিয়া ও আখেরাতের একরি পর্দা বা আড়াল বিশেষ। এজন্যই একে বরযখ বলা হয়।
সাধারনত মানুষ যেহেতু তাদের মৃতদেরকে কবরে সমাহিত করে, সেহেতু হাদীসের ভাষায় বরযখকালের শান্তি ও শাস্তিকে কবর আযাব নামেই উল্লেখ করা হয়েছে। এর মর্ম এই নয় যে, যেসব মৃতকে আগুনে জ্বালানো হয়, বা গভীর পানিতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, তারা বরযখের সময়কালে জীবিন্ত থাকেনা। আসলে তারাও বরযখে জীবন্ত কাল কাটায়। তারা হয় শান্তিতে না অথবা শাস্তিতে নিপতিত থাকে। যারা কাফের ও মুশরিক অবস্থায় মারা যায়, তারা বরযখের জীবনে কোন আরাম বা শান্তি ভোগ করতে পারেনা। তারের জন্য রয়েছে শাস্তি আর শাস্তি। আল্লা তাআ'লা মানব দেহের জলন্ত ভস্ম একত্রিত করেও শান্তি বা শাস্তি দিতে পুরো মাত্রায় সক্ষম। হাদীসে আছে, পূর্ব যমানায় এক ব্যক্তি খুবই গুনাহের কাজ করত। তার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হলে সে পুত্রগণকে এ ওছিয়ত করলো যে, তোমরা আমার মরদেহটি আগুনে জালিয়ে দেবে, আর আমার ছাইভষ্মের অর্ধেক বায়ুমন্ডলে উরিয়ে দেবে এবং বাকী অর্ধেক সমুদ্রের গভীর পানিতে মিশিয়ে নিঃশেষ করে ফেলবে। এরপর সে আরো বললো, আল্লাহ তাআ'লা যদি এরপরও আমাকে জীবিত করতে সক্ষম হন, তাহলে অবশ্যই আমাকে এমন কঠোর শাস্তি দেবেন, যা আমাকে ছাড়া ত্রিভুবনে আর কাউকে দেবেননা।
লোকটির মৃত্যুর পর পুত্রগণ পিতার অন্তিমকালের ওছিয়তমত কাজ করল। অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা সমুদ্রকে ঐ ব্যক্তির দেহ ভস্মগুলোকে একত্রিত করার নির্দেশ দিলে সমুদ্র তা একত্রিত করল। এমনি ভাবে স্থলভাগের বায়ুমন্ডলকে ভষ্মগুলোকে একত্রিত নির্দেশ দিলে সে-ও তা একত্রিত করল। তখন আল্লাহ তাআ'লা উভয় স্থানের ভষ্ম একত্রিত করে তাকে জীবিত করলেন। অতঃপর জিজ্ঞেস করলেনঃ তুমি এমন ওছিয়ত কেন করলে? সে বললো, হে আমার প্রতিপালক! আমি যে তুমার শাস্তির ভয়ে এরুপ করেছি, তাতো তুমি ভালভাবেই অবগত আছ। অতঃপর আল্লাহ তাআ'লা একে ক্ষমা করে দেন। -(বোখারী, মুসলিম)
হাদীসের বর্ণনা দ্বারা এও জানা যায় যে, মৃত্যুর পর মুমিন বান্দাগণ একে অপরের সাথে সাক্ষাত করেন। আর নবাগত মৃত মুমিন ব্যক্তির কাছে অপরাপর মুমিন ব্যক্তিরা জিজ্ঞেস করে- অমকের অবস্থা কি? সে কি অবস্থায় আছে?
হযরত সাঈদ ইবনে জুবায়ের (র) বলতেন, কারো মৃত্যু হলে কবরের জীবনের তার মৃত সন্তাগণ তাকে এমন ভাবে সম্বর্ধনা জানায়, যেরুপ পার্থিব জীবনে কোন বহিরাগত লোককে সম্বর্ধনা জানানো হয়। -(শহরে সুদুর)
হযরত ছাবেত বানানী (র) কারো মৃত্যুর পর কবর জীবনে তার পূর্বে মৃত নিকটাত্মীয়গণ তার কাছে এসে তাকে ঘিরে ধরে। তারা পরষ্পর এতো বেশী খুশী হয়, যেমন পার্থিব জীবনে বহিরাগত কারো আগমন হলে তার সাথে সাক্ষাতে খুশী হয়ে থাকে। -(শহরে সুদুর)
হযরত কায়েস ইবনে কোবায়সাহ (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলছেনঃ কেউ মুমিন অবস্থায় মৃত্যুবরণ না করলে তাকে অন্যান্য মৃতদের সাথে কথোপকথনের অনুমিত দেয়া হয়না। জৈনক সাহাবী (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! মৃতের সাথে কি অন্যান্য মৃতরাও কথা বলতে পারে? রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃ হ্যাঁ কথাত বলেই তদপরি তাদের পরষ্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাতও হয়। -(শহরে সুদুর, বুশরাল কাতীব বিলিকায়েল হাবীব-সুয়ুতী)
হযরত আয়শা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ যে ব্যক্তি তার মুসলমান ভাইয়ের কবর যিয়ারত করে এবং তার কবরের পাশে বসে, কবরে সমাহিত ব্যক্তি তাকে তার সালামের জওয়াব দেয় এবং যিয়ারতকারী চলে আসা পর্যন্ত তাকে চিনতে ও বুঝতে সক্ষম হয়। -(ইবনে আবি দুনিয়া ও শহরে সুদুর)
হযরত উম্মে বাশার (রাঃ) বলেন, আমি রসূলুল্লাহর (সাঃ) -এর কাছে জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ) মৃতরা কি একে অপরকে চিনতে পারে? তিনি বললেন, তোমার কল্যাণ হেক। মুতমাঈন আত্মা বা (যেসব মুমিনের আত্মা আল্লাহ তাআ'লার প্রতি সন্তুষ্ট থাকে, তা) জান্নাতে সবুজ পাখীর হৃদয় অভ্যন্তরে অবস্থান করে। এখন বুঝে নাও পাখীরা যদি বৃক্ষে থাকতে একে অপরকে চিনতে পারে, তাহলে মুমিনের আত্মাসমূহও একে অপরকে চিনে নিতে পারবে। -(ইবনে সায়াদ, শহরে সুদুর)
হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রাঃ) বলেন, রসূলুল্লাহ (সাঃ) বলেছেনঃ "যে ব্যক্তি কোরআন মজীদ পাঠ শিক্ষা শুরু করে শেষ করার পূর্বেই মারা যায়, কবরে একজন ফেরেশতা তাকে কোরআন মজীদ শিক্ষাদেন। আর সে আল্লাহ তাআ'লার সাথে এমন অবস্থায় সাক্ষাত করবে যখন সে সম্পর্ন কোরআন মজীদের হাফেজ হবে। -(শহরে সুদুর)
যারা এ পার্থিব জীবন পূর্ণময় কর্মে অতিবাহিত করেন এবং মৃত্যুর পরের জীবনের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস পোষন করেন, এ দুনিয়ার প্রতি তাদের মন আকৃষ্ট হয় না। তারা ইহকালের চেয়ে পরকালের জীবনকেই প্রাধান্য দেয়। আর যারা পার্থিব জীবনকে খারাপ ও অন্যায় কাজে অতিবাহিত করে তারা মৃত্যুর কথা স্মরনেই ভয় পায়।
সোলাইমান ইবনে আবদুল মালেক আবু হাযেম (র) এর কাছে জিজ্ঞেস করলেন, আমরা মৃত্যু সসম্পর্কে ভীত হই কেন বলবেন কি? তিনি বললেনঃ এর কারন হচ্ছে, তোমরা দুনিয়াকে খুব সুন্দর ভাবে আবাদ কর এবং পরকালকে বরবাদ কর। সুতরাং আবাদকৃত জায়গা হতে বরবাদকৃত স্থানে যাওয়া পছন্দ হয় না। সোলাইমান বললেন, আপনি যথার্থ বলেছেন। -(ফিকাতুস সাফওয়াহ ২য় খন্ড ৮৯ পৃ)
কবর জীবনের প্রতি যে সন্দেহাতীতভাবে বিশ্বাস রাখে এবং নিজের পূণ্যময় কর্মের প্রতিদানে সেখানে ভালো অবস্থায় থাকার আশা পোষন করে। আর মনে করে যে, এই পার্থিব জগতের ভাই-বন্ধু ও আত্মীয়-স্বজন করে চলে যেতে হবে। তারা কবরের জীবনেও আত্মীয়-স্বজন পরিচিত ব্যক্তিদের সাথে দেখা-সাক্ষাত লাভ করবে। সুতরাং মৃত্যুকে তার সুতরাং মৃত্যুকে তারা কেন ভায় পাবে? আর এ ক্ষণস্থায়ী পার্থিব জীবনকে কেনই বা কবর জীবনের উপর প্রধান্য দেবে? রসূল (সাঃ) বলেনঃ মানুষ এ পার্থিব জীবনকে খুব পছন্দ করে ও ভালবাসে। -(বায়হাকী- শেয়াবুল ঈমান)
কোন কোন বর্ণনায় আছে, রসূলুল্লাহ (সাঃ) মুমিনের জন্য মৃত্যুকে উপঢৌকন বলেছেন -(বায়হাকী ও মেশকাত)। তিনি এও বলেছেন, যে, মানুষ মৃত্যুকে খারাপ জানে ও অপছন্দ করে, অথচ দুনিয়ার ফেৎনা-ফাসাদ ও আল্লাহর পরীক্ষায় নিপতিত হওয়ার চেয়ে তার জন্য মৃত্যুই উত্তম। মৃত্যু যত তাড়াতাড়ি হবে, ততো তাড়াতাড়ি দুনিয়ার ফেৎনা-ফাসাদ থেকে নিরাপদ হওয়া যাবে। -(শহরে সুদুর)
হযরত আনাস (রাঃ) বলেন, রাসূল (সাঃ) বলেছেনঃ মানুষের দুনিয়া হতে ইন্তেকাল করে পরকালে চলে যাওয়ার উদাহরন হচ্ছে -শিশু যেমন মায়ের সংকীর্ণ ও অন্ধকার জঠোর হতে জন্ম লাভ করে পার্থিব জগতের আলো-বাতাসের আরামপ্রদ ও সুন্দর পরিবেশে চলে আসে, অনুরুপ ভাবে মানুষ দুনিয়ার অশান্তিময় জীবন হতে ইন্তেকাল করে। এক বিরাট প্রশস্তময় জীবনে প্রদার্পন করে। মোট কথা মুমিনের জন্য মৃত্যু খুবই উত্তম বিষয়। কিন্তু শর্ত হচ্ছে তার জীবন হতে হবে পূ্ণ্যময় জীবন এবং তার ও আল্লাহ তাআ'য়ালার মধ্যকার সম্পর্ক সঠিক ও সুন্দর রাখতে হবে। আল্লাহ তাআ'য়ালার যেসব বান্দা পুণ্যময় কর্মে জীবন অতিবাহিত করেন, তাঁরা মৃত্যুকে পার্থিব জীবনের উপর প্রধান্য দেন। পার্থিব জীবনের বিপদাপদ, ফেৎনা ও অস্থিরতাপূর্ণ জীবন থেকে বের হয়ে খুব তাড়াতাড়ি পরকালে চিরশান্তি ও সুখময় জীবনে পদার্পণ করতে আগ্রহী থাকেন।
কোন একসময় হযরত আবু হোরায়রা (রাঃ) জৈনক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, কোথায় যাচ্ছো? সে বললো, বাজারে যাওয়ার ইচ্ছা রাখি। তখনি তিনি বললেন, যদি তোমার পক্ষে সম্ভব হয় তাহলে আমার জন্য মৃত্যু ক্রয় করে নিয়ে আসবে।-(ইবনে আবূ শায়রা, বায়হাকী)
একথার মর্ম হচ্ছে- এ দুনিয়ায় বসবাস করা আমার পছন্দ নয়। যদি মূল্য দ্বারাও মৃত্যু ক্রয় করা যায় তবে তা ক্রয় করে নেব।
হযরত খালেদ ইবনে মায়াদান (রাঃ) বলতেন, যদি কেউ এ কথা বলে, অমক জিনিষ যে ষ্পর্স করবে, তৎক্ষণাত সে মারা যাবে। তাহলে আমার পূর্বে কেউ তা ষ্পর্স করতে পারবেনা। তবে কেউ যদি আমার চেয়ে বেশি দৌঁড়াতে পারে এবং আমার পূর্বেই তার নিকটে পৌঁছে যায়, তাহলে অন্যকথা। -(ইবনে সায়াদ)

No comments